Home » মতামত » প্রসঙ্গ জিপিএ ৫: বাংলাদেশী শিক্ষা ব্যবস্থা

প্রসঙ্গ জিপিএ ৫: বাংলাদেশী শিক্ষা ব্যবস্থা

জুন ১১, ২০১৬ ৫:২২ পূর্বাহ্ণ Category: মতামত A+ / A-

wnewsbd.com:

 প্রসঙ্গ জিপিএ ৫: বাংলাদেশী শিক্ষা ব্যবস্থা

মনজুরুল ইসলাম মেঘ

১. যখন একটি দেশের শিক্ষা ব্যবস্থার উন্নয়ণ ও পেশাগত দায়িত্ববোধ নাগরিকদের মধ্যে বেড়ে যায় তখন সেই দেশ উন্নয়ণে এগিয়ে যায়। সামপ্রতিক কালে বাংলাদেশের এই দুটি জিনিসের চরম অবনতি লক্ষ্য করা যায়। শিক্ষার মান কমতে কমতে বর্তমানে এমন এক পর্যায়ে এসে দাঁড়িয়েছে, যেখানে সবার ই ধারনা মানসম্মত শিক্ষা এ দেশে হচ্চেনা। আসলে তা না এখনো এই দেশে মান সম্মত শিক্ষা হচ্ছে তবে আরো ভালো গুনগত শিক্ষার দরকার। বিভিন্ন পেশার মানুষকে নিয়ে এ দেশে বেশ কিছু নেতিবাচক ধারণা আছে যে তারা পেশাগত দায়িত্ববান নয়। বিশেষত অনেকেই মনে করেন এ দেশে সৎ সাংবাদিকের অভাব। অনেকের ই ধারনা যারা সাংবাদিকতা করেন তারা বেশির ভাগ ই অসৎ, অযোগ্য, কোন পেশায় ভাল কিছু করতে না পেরে সাংবাদিকতায় এসেছে। আসলে কিছু অসৎ অযোগ্য সাংবদিক থাকলেও এই দেশে এখনো অনেক নির্ভিক সত্য সন্ধানী সাংবাদিকও আছেন। আসল কথায় ফিরে আসি। গত কয়েক দিন আগে একটি বেসরকারী টেলিভিশনে প্রচারিত একটি প্রদিবেদনে কয়েক জন মাধ্যমিক উর্ত্তীন শিক্ষার্থীকে গতানুগতিক কয়েকটি প্রশ্ন করা হয় যার কোন প্রশ্নের উত্তর ঐ শিক্ষার্থীরা দিতে পারেননি। প্রতিবেদক একে বারে নিজের মতন করে প্রশ্ন করেন এবং দেশের শিক্ষার মান ও প্রচলিত জিপিএ ৫ এর মান নিয়ে কথা তুলেন। সেই সংবাদের ভিডিও এখন সোস্যাল মিডিয়াতে আলোচনা সমালোচনার ঝড় বয়ে বেড়াচ্ছে।

২. আসল কথা হলো এই দেশে প্রতি বছর কয়েক লক্ষ শিক্ষার্থী মাধ্যমিক পরিক্ষায় অংশগ্রহণ করে। তাদের মধ্যে থেকে প্রায় লক্ষাধিক শিক্ষার্থী জিপিএ ৫ পেয়ে উর্ত্তীন হয়। আগের থেকে এখনকার শিক্ষার্থীরা তথ্য ও প্রযুক্তির কারণে অনেক কিছুই জানতে পারতেছে এবং শিখতেও পারতেছে। শিক্ষার্থীরা গতানুগতিক মুখস্ত বিদ্যার মধ্যে আবদ্ধ না থেকে সৃজনশীল প্রশ্নের মাধ্যমে নিজেদের মেধার বিকাশ করতেছে। সামগ্রিক ভাবে প্রায় লক্ষাধিক শিক্ষার্থীর জিপিএ ৫ মূল্যায়ণ করতে হলে মাত্র কয়েক জন শিক্ষার্থীকে কয়েকটি প্রশ্ন করে দেশের সকল জিপিএ ৫ পাওয়া শিক্ষার্থীদের মেধা বা শিক্ষার মান মূল্যায়ন করা সম্ভব নয়। A+সাধারণত ক্যামেরার সামনে অনেক বিখ্যাত অভিনেতা-অভিনেত্রীরাও অনেক সময় জানা জিনিস ভুল করে, সংলাপ ভুলে যায়। সেখানে সবে মাত্র এসএসসি পাশ করা ছাত্র-ছাত্রীরা প্রতিবেদকের ক্যামেরার সামনে জানা উত্তর এলোমেলো বা ভুল করা অস্বাভাবিক নয়। প্রদিবেদক প্রশ্ন করেছেন জিপিএ পূর্ণরুপ কি? ঐ কয়জন শিক্ষার্থীদের মধ্যে থেকে কেউ সঠিক উত্তর দিতে পারেনি। আর সেই কারনে যদি জিপিএ ৫ এর মান বলতে কিছু না থাকে। তাহলে আমি একজন শিক্ষক হিসাবে দেশ বাসীর কাছে জানতে চাইবো আপনি যে দেশে বসবাস করেন সেই দেশের নাম কি? সভাবতই বেশীর ভাগ উত্তর দিবেন বাংলাদেশ। কিন্তু এই বাংলাদেশের যে একটি পরিপূর্ণ নাম আছে গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ। এটা নিশ্চয় অনেকেই বলবে না। তাহলে যে ব্যাক্তি গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ বলবেনা বা বলতে পারবেনা তিনি কি এই দেশের নাগরিক নয় ? তাকে কি বলবেন আপনি এই দেশে থাকার অধিকার রাখেন না! নাকি বলবেন আপনার জন্ম স্থান পরিচয় নাই। যা হোক এটা না হয় বাদ ই দিলাম। গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ এর ইংরেজী অনুবাদ করতে পারবেন কতজন সেটা একবার অনুমান করেন দেখুন।

৩. প্রতিবেদক সাহেব আপনি মাত্র কয়েকটি প্রশ্ন করে কোন শিক্ষার্থীকে মূল্যায়ন করতে পারবেন না আর হাতে গোনা কয়েকজন শিক্ষার্থীকে যাচায় করে সারা দেশের শিক্ষার্থীদের মান নিয়ে প্রশ্ন তোলার অধিকার আপনাকে কেউ দেয়নি। আপনি যদি নিজেকে হাইলাইট বা টেলিভিশনের টিআরপি বাড়ানোর জন্য এই ধরনের সংবাদ পরিবেশন করে থাকেন তাহলে একজন সাংবাদিক হিসাবে বলবো এটা চরম অবক্ষয় ও অনৈতিক কাজ। আপনি একটি প্রতিবেদন তৈরী করতে চাচ্ছেন ঠিক আছে। আপনার কাজের স্বাধীনতা অবশ্যই আছে। আপনি বাংলাদেশের জিপিএ ৫ নিয়ে সংবাদ পরিবেশন করবেন সেটাও ঠিক আছে। আপনি এই সংবাদ ই করবেন ধরে নিলাম সেটাও ঠিক আছে। কিন্তু সাংবাদিকতার নীতি নৈতিকতা অনুযায়ী ঐ শিক্ষার্থীদের চেহারা অস্পষ্ট করে দিলেন না কেনো? আপনি কি জানেন তারা সারা দেশ বাসীর কাছে নিবোর্ধ হিসাবে পরিচিত হলো। আপনার সাজানো নাটকের কারনে কতগুলো ছেলে মেয়ের আগামি ভবিষ্যত কি কষ্টে কাটবে আপনি কি জানেন? আপনি কি জানেন এই ধরনের সংবাদ পরিবেশন করায় লক্ষ লক্ষ ছেলে মেয়ে যারা জিপিএ ৫ পেয়েছে তারা কতটা হতাশ হয়েছে। আসলে এই দেশে এখনো অনেক মেধাবী ছাত্র-ছাত্রী জন্ম গ্রহন করে । তারা জাতীয় ও আন্তর্জাতিক বিভিন্ন প্রতিযোগীতায় অনেক ক্ষেত্রেই সফল হচ্ছে এবং তারা জিপিএ ৫ পাওয়া ছাত্র-ছাত্রী। অবশ্য মেধার পরিমাপ করতে জিপিএ ৫ ই যথেষ্ট নয়। তবে একাডেমিক শিক্ষার ফলাফলের ভিত্তিতে এটা অনেক জরুরী।

৪. আমাদের দেশে শিক্ষা খাতে সব থেকে বাজেট থাকে কম। স্বল্প বাজেটে এখনো এই দেশে যে শিক্ষা পাওয়া যায় তা সম্ভবত বিশ্বে আর কোন দেশে পাওয়া যায় না। ইউনেস্কোর মতে কোন দেশের মোট জিডিপির ৬% বরাদ্দ রাখতে হবে শিক্ষা খাতে। যেখানে বাংলাদেশের জন্য গত বাজেট ছিলো মাত্র ১.৯%। তার আগের বাজেটে ছিলো ২.১৬%। আর এই বার সম্প্রতি ঘোষিত বাজেটে মাননীয় অর্থমন্ত্রী এটিকে বাড়িয়ে করেছেন ২.২৫%। শিক্ষা ক্ষেত্রে এই যদি হয় আমাদের বাজেট তাহলে কোমলমতী শিক্ষার্থীদের দোষ দিয়ে কি লাভ। আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থার উন্নয়ণ করতে হলে শিক্ষা খাতে বাজেট বাড়াতে হবে। গুনগত মানের শিক্ষার জন্য শিক্ষকদের প্রশিক্ষনের ব্যবস্থা রাখতে হবে। এ দেশে এখনো অনেক শিক্ষক আছেন যারা সৃজনশীল প্রশ্ন পদ্ধতি বুঝেন না। সে সকল শিক্ষকদের প্রশিক্ষনের মাধ্যমে দক্ষ করে গড়ে তুলতে হবে। অনভিজ্ঞ শিক্ষকরা সরাসরি গাইড বই এর উপর নির্ভশীল। ফলে শিক্ষার্থীদেরকে সৃজনশীল মেধার বিকাশ হচ্ছেনা। গুনগত মান শিক্ষার জন্য কোচিং সেন্টার বন্ধ করতে হবে। বাজার থেকে সকল প্রকার গাইড বই তুলে নিতে হবে এবং গাইড বই প্রকাশনা ও বাজারজাত করনে কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে। শিক্ষক নিয়োগ বানিজ্যিকরণ বন্ধ করতে হবে। পরীক্ষার আগে প্রশ্নপত্র ফাঁস বন্ধ করতে হবে। প্রশ্নপত্র ফাঁসের কারনে অনেক মেধাবী শিক্ষার্থীর ফলাফল খরাপ হচ্ছে। আবার দুর্বল শিক্ষার্থীরা ভালো ফলাফল করতেছে। আমি অনেক গ্রামের শিক্ষার্থীদের কথা জানি যারা সারা রাত হেরিকিন জ্বেলে লেখাপড়া করে। তারা এখনো প্রশ্ন ফাঁস হবার পরেও সেগুলো পায়না। তারা কিন্তু সত্যিকার অর্থেই লেখা পড়া করে জিপিএ ৫ পাচ্ছে। আবার শহরের ও অনেক সচেতন শিক্ষার্থী আছে যারা ভালো ভাবেই লেখা পড়া করতেছে এবং উচ্চ শিক্ষাতে ভালো করতেছে। এখন কথা হলো শিক্ষা ব্যবস্থার উন্নয়ন করতে হলে শিক্ষার্থীদের দোষ দিয়ে কোন লাভ হবেনা। এর জন্য শিক্ষা ব্যবস্থার উন্নয়ন করতে হবে। অবকাঠামো গত উন্নয়ন এর পাশা পাশি নৈতিক উন্নয়ন দরকার। আমাদের দেশে নৈতিক শিক্ষার বড়ই অভাব। নৈতিক শিক্ষা থাকলে এ দেশে কোচিং বানিজ্য, গাইড বই প্রকাশ, প্রশ্নপত্র ফাঁসের মতন জঘন্য কাজ হতোনা। এই জঘন্য কাজের সাথে যারা জড়িত তাদের কে আইন এর আওতায় নিয়ে আসা উচিত বলে মনে করছি। আমাদের সবার উচিত আমাদের সন্তানদের সুশিক্ষা ও মানসর্ম্পূণ শিক্ষার জন্য সচেতন হওয়া। এখন ই যদি আমরা সচেতন না হই তাহলে অদূর ভবিষ্যতে এই দেশের গুনগত মানসর্ম্পূণ শিক্ষা ব্যবস্থা ধ্বংস হয়ে যাবে। সরকারের পাশা পাশি ব্যক্তিগত উদ্যোকে শিক্ষার উন্নয়নে সবার এগিয়ে আসা উচিৎ।

প্রসঙ্গ জিপিএ ৫: বাংলাদেশী শিক্ষা ব্যবস্থা Reviewed by on . wnewsbd.com:  প্রসঙ্গ জিপিএ ৫: বাংলাদেশী শিক্ষা ব্যবস্থা মনজুরুল ইসলাম মেঘ ১. যখন একটি দেশের শিক্ষা ব্যবস্থার উন্নয়ণ ও পেশাগত দায়িত্ববোধ নাগরিকদের মধ্যে বেড়ে যা wnewsbd.com:  প্রসঙ্গ জিপিএ ৫: বাংলাদেশী শিক্ষা ব্যবস্থা মনজুরুল ইসলাম মেঘ ১. যখন একটি দেশের শিক্ষা ব্যবস্থার উন্নয়ণ ও পেশাগত দায়িত্ববোধ নাগরিকদের মধ্যে বেড়ে যা Rating: 0
scroll to top